আজকের বাংলাদেশ নারী ও শিশুর সুরক্ষার প্রশ্নে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে । সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু রামিসা আক্তারের ওপর যে পৈশাচিক ও নৃশংস বর্বরতা চালানো হয়েছে, তা গোটা জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে । কিন্তু এই ক্ষত কেবল রামিসাতেই সীমাবদ্ধ নয়: আসিয়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু ও নারী এমন অবর্ণনীয় নির্যাতন, ধর্ষণ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে । এই প্রতিটি ঘটনা কেবল এক একটি অপরাধ নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক সামাজিক নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ । ২০০৪ সাল থেকে মানব ও সমাজসেবায় নিয়োজিত ‘পদ্মা সমাজ সেবা সংস্থা’র পক্ষ থেকে আমরা এই সকল জঘন্য অপরাধের তীব্র নিন্দা জানাই এবং প্রতিটি ঘটনার অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি করছি ।
১. বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রভাব
দেশে শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনা জ্যামিতিক হারে বাড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অপরাধীদের পেছনে থাকা স্থানীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য হাত । অনেক সময় জঘন্য অপরাধীরাও ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী মহলের পরিচয় ব্যবহার করে তদন্তকে প্রভাবিত করার এবং পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে । পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি, আলামত নষ্ট করা কিংবা সাক্ষীদের ভয় দেখানোর মতো অপচেষ্টাও লক্ষ্য করা যায় ।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলাগুলো বছরের বছর ঝুলে থাকে । এই বিলম্বিত বিচার ব্যবস্থা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে । আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই-ধর্ষক ও খুনিদের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় থাকতে পারে না, এবং অপরাধীদের রক্ষাকারীদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি ।
২. সমাজসেবা ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত করণীয়
কেবল আইন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সমাজসেবামূলক মানসিকতা ।
- পারিবারিক সচেতনতা: প্রতিটি পরিবারে শিশুদের শরীরের অধিকার এবং ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা দিতে হবে । শিশুরা যেন যেকোনো সমস্যা নির্ভয়ে বলতে পারে, এমন খোলামেলা পরিবেশ তৈরি করতে হবে ।
- প্রতিবেশী ও কমিউনিটির নজরদারি: পাড়া-মহল্লায় নতুন ভাড়াটে বা অপরিচিত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে । কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ্য করলে নীরব না থেকে অবিলম্বে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে ।
- সামাজিক প্রতিরোধ ও ঐক্য: এলাকাভিত্তিক সমাজসেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সেন্টারে শিশু ও নারী সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক আলোচনার আয়োজন করতে হবে । নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে আর্থিক ও মানসিকভাবে দাঁড়ানো আমাদের नैतिक দায়িত্ব ।
৩. প্রশাসন ও সরকারের দায়বদ্ধতা
একটি নিরাপদ ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের গাঠনিক পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি । এই লক্ষ্যে সরকারের অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত:
- বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার: প্রতিটি জেলায় শিশু ও নারী নির্যাতন মামলার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করতে হবে ।
- প্রভাবমুক্ত প্রশাসন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবে মামলার মেরিট নষ্ট না হয় ।
- সুরক্ষা ও তথ্যভাণ্ডার: আবাসিক এলাকাগুলোতে ভাড়াটেদের তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ সুরক্ষা সেল গঠন এবং যৌন অপরাধীদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার (Sex Offender Registry) তৈরি করা প্রয়োজন ।
মনোসামাজিক সহায়তা: ভিকটিম এবং তাদের পরিবারকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় আইনি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে ।